করোনাযুদ্ধে খাদ্যের ভুমিকা

রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২০, ০৮:০৩ অপরাহ্ন

করোনাযুদ্ধে খাদ্যের ভুমিকা

বর্তমানে বিশ্বের এক বহুল আলোচিত বিষয় হচ্ছে নোভেল করোনাভাইরাস। এই ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত রোগকে বলা হয় COVID-19। এটি সর্বপ্রথম চীনের হুবেই প্রদেশের ঊহান শহরে দেখা যায়। দিনটি ছিল ৩১ ডিসেম্বর ২০১৯ যখন প্রথম COVID-19/করোনাভাইরাস এর আক্রান্ত ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া যায়।

চীন থেকেই শুরু হয় এই ভাইরাসের সংক্রমণ। বর্তমানে বিশ্বের ১৯০ টির ও অধিক দেশে ছড়িয়ে পড়েছে এই ভাইরাসের সংক্রমণ। ১১ ই মার্চ ২০২০ সালে করোনাভাইরাসকে বিশ্ব মহামারী হিসেবে আখ্যায়িত করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশে ও COVID-19/করোনাভাইরাসের আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা লক্ষণীয়। একদিকে যেমন এই রোগের চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা কঠিন অন্যদিকে আমাদের দেশের মতো জনবহুল দেশগুলোর পক্ষে এর মোকাবেলা করা আরও জটিল।

 

প্রায় সকল বয়সের ব্যক্তিবর্গ এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে তবে প্রবীণ সমাজ, রোগাক্রান্ত ব্যক্তি এবং শিশুরা বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। অথবা বলতে পারি যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল তারাই এই রোগে বেশি ভুগছে এবং মৃত্যুবরণ করছে। ভাইরাস সংক্রমণে জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্টের লক্ষণ দেখা যায় বিশেষ করে করোনভাইরাস সংক্রমণে/COVID-19, যা দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। আর যেহেতু এখন পর্যন্ত এই রোগের কোন ভ্যাকসিন আবিষ্কার হয়নি তাই করোনাযুদ্ধে আমাদের দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করাই হোক একমাত্র হাতিয়ার।

 

 

দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে পুষ্টিকর ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবারের কোন বিকল্প নেই। ভিটামিন-এ, সি, ই, বিটাক্যারোটিন, লাইকোপেন, লিটেইন, সেলেনিয়াম ইত্যাদি অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের অন্যতম উৎস। আসুন জেনে নেই দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় কি কি খাবার যুক্ত করে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারি। দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভিটামিন-সি এর ভূমিকা অপরিসীম। WHO তথ্য মতে দৈনিক 90 মিলিগ্রাম ভিটামিন সি খাওয়া প্রয়োজন, যা দেহের ভিটামিন-সি এর চাহিদা পূরণ করে। এখন কথা হল কোন কোন খাবার খেলে ভিটামিন-সি এর চাহিদা পূরণ হবে এবং তা কি পরিমাণে খেতে হবে। আমাদের দেশে অনেক ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ ফল রয়েছে।

 

বাংলাদেশে ভিটামিন-সি এর সবথেকে সহজলভ্য উৎস গুলোর মধ্যে একটি হলো পেয়ারা। ভিটামিন-সি এর দিক থেকে চিন্তা করলে আমলকির পরেই এর স্থান। প্রতি ১০০ গ্রাম পেয়ারায় প্রায় ২১০ মিলিগ্রাম ভিটামিন-সি পাওয়া যায়। এছাড়াও আমরা ভিটামিন-সি এর জন্য খেতে পারি আমলকি, লেবু, কমলা, মালটা, টমেটো, কাঁচামরিচ, টক দই ইত্যাদি। যেহেতু ভিটামিন-সি water-soluble ভিটামিন তাই এটি পরিমাণের চেয়ে বেশি খাওয়া হলেও তা মানবদেহে কোন ক্ষতি সাধন করে না।

 

 

তাই আমাদের সকলের বেশি বেশি ভিটামিন-সি যুক্ত খাবার (দৈনিক অন্তত ১ টি করে পেয়ারা অথবা ২ টি লেবু) খেতে হবে। মিনারেলস গুলোর মধ্যে জিংক ও ম্যাগনেসিয়াম এর উপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। একজন প্রাপ্তবয়স্কের জন্য দৈনিক ১১ মিলিগ্রাম জিংক প্রয়োজন। প্রায় সকল প্রাণীজ খাবারেই জিংক রয়েছে।

 

তবে ছোট মাছ, লাল মাংস, বাদাম এবং মাশরুম উল্লেখযোগ্য। মনে রাখবেন মাছ, মাংস খাবার আগে ভালোভাবে রান্না করে নিতে হবে। একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির দৈনিক ৪০০ মিলিগ্রাম ম্যাগনেসিয়াম প্রয়োজন। প্রায় সকল প্রকার সবুজ শাকসবজিতে ম্যাগনেসিয়াম থাকে তবে মটরশুঁটি, কাজুবাদাম উল্লেখযোগ্য।

 

৮০ গ্রাম মিষ্টি কুমড়ার বীজ থেকে প্রায় ৪০০ মিলিগ্রাম ম্যাগনেসিয়াম পাওয়া সম্ভব। এছাড়া সেলেনিয়ামের অভাব পূরণের জন্য আমরা মাংস, টুনা মাছ, ইলিশ মাছ, ডিম, দুধ ও কলা খেতে পারি। ভিটামিন-ডি এর অভাবে শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ ও ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাছাড়া ভাইরাস সংক্রমণ কে প্রতিহত করতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে ভিটামিন-ডি। সূর্যের আলো আমাদের দেহে ভিটামিন-ডি তৈরি করে থাকে।

 

এছাড়া দুগ্ধজাতীয় খাবার ও ডিমের কুসুমে ভিটামিন-ডি পাওয়া যায়। তাই আমাদের প্রতিদিন অন্তত ১০ মিনিট করে হলেও সূর্যস্নান করা উচিত। এছাড়াও অন্যান্য অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবার সমূহ- পেঁপে, আনার, আনারস, আম, তরমুজ, গাজর, জলপাই, বাদাম, সিমের বিচি, মটরশুঁটি, আদা, রসুন, হলুদ, দারুচিনি, গোলমরিচ, কালিজিরা ইত্যাদি। পরিমিত ঘুম আমাদের দেহে কার্টিসল হরমোনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। তাই পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুম দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে।

 

তবে কিছু কিছু খাবার দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। এলকোহল (মদ), সিগারেট, অতিরিক্ত তেলে ভাজা খাবার, কার্বনেটেড বেভারেজ, তামাক পাতা, সাদা পাতা, জর্দা, খয়ের এবং অতিরিক্ত চিনি ও ঠান্ডা জাতীয় খাবার খাওয়া থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে। আমাদের দৈনন্দিন খাবারের তালিকায় উল্লেখ্য অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবার সমূহ যুক্ত করতে হবে। এতে করে অন্তত আবহাওয়া পরিবর্তনজনিত জ্বর, ঠান্ডা, কাশি, শ্বাসকষ্টের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে এবং এটি দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করবে।

 

মনে রাখবেন দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভিটামিন-সি এর কোন বিকল্প নেই। আমাদের সচেতনতাই পারে করোনাভাইরাস/COVID-19 ও অন্যান্য ভাইরাসের সংক্রমণের হাত থেকে দেশ ও জাতিকে রক্ষা করতে। তাই এসকল পুষ্টিকর খাবারের পাশাপাশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে, পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করতে হবে, বারবার সাবান দিয়ে ২০ সেকেন্ড ধরে হাত ধুতে হবে, যেখানে সেখানে থুথু ফেলা যাবে না, হাঁচি-কাশির শিষ্টাচার মেনে চলতে হবে। কেননা আমরা সংক্রমণের হাত থেকে মুক্ত থাকলেই সংক্রমণ হাত থেকে মুক্ত থাকবে আমাদের পরিবার-পরিজন ও দেশ।

সূত্রঃ WHO, UNICEF, ISOM, IEDCR

নিউট্রিশনিস্ট তানজিল ইসলাম ইয়াদ
বিএসসি. নিউট্রিশন এন্ড ফুড সায়েন্স

Please Share This Post in Your Social Media











© AMS Media Limited
Developed by: AMS IT BD