যে সকল সমস্যার সমাধান থাকছে গুচ্ছভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষায়

যে সকল সমস্যার সমাধান থাকছে গুচ্ছভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষায়

নিজস্ব প্রতিবেদক:
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০ তারিখে সমন্বিত পদ্ধতি থেকে সরে এসে গুচ্ছভিত্তিক পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে যা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। এখানে উল্লেখ্য যে, গত ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০ তারিখে ‘দ্যা টাইমস অব বাংলাদেশ’-এ প্রকাশিত একটি জরিপ অনুযায়ী ৩০২ জন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে মাত্র ২ শতাংশ শিক্ষক সমন্বিত পরীক্ষার পক্ষে মতামত দিয়েছিলেন যেখানে গুচ্ছভিত্তিক পরীক্ষার পক্ষে মতামত ছিল প্রায় ৩৫ শতাংশ শিক্ষকদের।

 

অপরদিকে প্রচলিত পদ্ধতির পক্ষে ছিলেন প্রায় ৬৩ শতাংশ শিক্ষক। সিদ্ধান্ত গ্রহণের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির কথা চিন্তা করলে এটা সুস্পষ্ট যে সমন্বিত পদ্ধতির চেয়ে গুচ্ছভিত্তিক পদ্ধতি অধিকতর গ্রহণযোগ্য। গুচ্ছভিত্তিক পদ্ধতির পক্ষে এই জনমত আরো বাড়বে বলে আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস।

 

গুচ্ছভিত্তিক ভর্তি পদ্ধতির মাধ্যমে প্রচলিত পদ্ধতির অনেকগুলো সমস্যার সমাধান সম্ভব যদিও ইউজিসি বারবার শুধু দুইটি বা তিনটি সমস্যা সমাধানের কথাই বলে আসছে। আসুন দেখা যাক প্রচলিত পদ্ধতির কোন কোন সমস্যার সম্ভাব্য সমাধান থাকছে গুচ্ছভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষায়। ১. প্রচলিত পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষায় একজন শিক্ষার্থীকে যেখানে আনুমানিক প্রায় ৩০ থেকে ৪০ টি আলাদা ভর্তি ফরম কিনতে হতো গুচ্ছভিত্তিক পরীক্ষায় মাত্র ৪ থেকে ৫ টি ফরমই যথেষ্ট।

 

২. দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার উদ্দেশ্যে যাতায়াত করা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর ও ব্যয়বহুল ছিল কিন্তু গুচ্ছভিত্তিক পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা তাদের সুবিধাজনক কেন্দ্রে পরীক্ষা দিতে পারবে। ৩. দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া এবং বিভিন্ন ইউনিট ও বিষয়ভিত্তিক পরীক্ষা হওয়ায় একই দিনে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে অনেকবার যার ফলে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনেক শিক্ষার্থী কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে পারেনি।

 

উদাহরণস্বরূপ, ২০১৯-২০২০ শিক্ষাবর্ষে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে একই দিনে কিছু ইউনিটের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ৪. প্রচলিত পদ্ধতির একটি বড় সমস্যা ছিল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের বিষয় ও কাঠামোগত ভিন্নতা যার ফলে শিক্ষার্থীদেরকে এক ধরণের মানসিক চাপ ও হতাশার মধ্য দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হতো।

 

গুচ্ছভিত্তিক পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা একটি নির্দিষ্ট সিলেবাসের আলোকে প্রস্তুতি গ্রহণের সুযোগ পাবে। ৫. অপেক্ষাকৃত নতুন বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতাসম্পন্ন অধ্যাপক ও লজিস্টিক সাপোর্ট না থাকায় সঠিক সময়ে ভর্তি পরীক্ষা নিতে হিমশিম খাচ্ছিল। উদাহরণস্বরূপ, গতবছর উক্ত কারণে বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা পূর্বনির্ধারিত সময়ের প্রায় এক মাস পরে গ্রহণ করা হয়েছিল। গুচ্ছভিত্তিক পদ্ধতিতে এ সমস্যাটিরও সমাধান থাকবে আশা রাখছি।

 

৬. পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের ভর্তি পরীক্ষার স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা বেশ ভাল হওয়া সত্ত্বেও কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে পত্রপত্রিকায় বিভিন্ন ধরণের অপ্রীতিকর ও দুর্নীতির খবর আসতো। গুচ্ছভিত্তিক পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষার স্বচ্ছতা আরো বৃদ্ধি করা সম্ভব বলেই মনে হচ্ছে। যদিও গুচ্ছভিত্তিক পদ্ধতিতে প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকানো একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবেই থেকে যাবে। ৭. প্রচলিত পদ্ধতিতে একেক বিশ্ববিদ্যালয় একেকভাবে ফলাফল প্রকাশ করতো যার ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরণের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ব্যবধান তৈরি হতো।

 

ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় প্রাপ্ত বিষয়ভিত্তিক ফলাফল প্রকাশ করে দেওয়া হয় যার ফলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে পরীক্ষার স্বচ্ছতার ব্যাপারে এক ধরণের ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়। অপরদিকে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় প্রাপ্ত মোট নম্বরটাও প্রকাশ না করে শুধুমাত্র মেধা ও অপেক্ষামান তালিকা প্রকাশ করে। চাইলে গুচ্ছভিত্তিক পরীক্ষার মাধ্যমে এ সমস্যারও একটি সমাধান করা সম্ভব।

 

অবশ্য এক্ষেত্রে বিষয়ভিত্তিক ফলাফল প্রদানের বিষয়টি কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় রাখতে হবে। সব পদ্ধতিরই কিছু ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক থাকবে তবে যেহেতু এখনো পর্যন্ত বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ প্রচলিত পদ্ধতির পক্ষে মতামত দিচ্ছেন তাই সংশ্লিষ্টদের উচিৎ আরো তথ্যভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমে কর্মপন্থা নির্ধারণ করা।

 

প্রয়োজনে গুচ্ছভিত্তিক ভর্তি পদ্ধতির সুবিধা ও প্রচলিত পদ্ধতির অসুবিধাসমূহ তালিকাবদ্ধ করে জনমত বৃদ্ধি করতে হবে। কোনভাবেই অবৈজ্ঞানিক ও অগণতান্ত্রিকভাবে গৃহীত সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। উল্লেখ্য যে, গত শিক্ষাবর্ষে প্রথমবারের মতো কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে গুচ্ছভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছিল যা শিক্ষক, ছাত্রছাত্রী, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© AMS Media Limited
কারিগরি সহায়তা: Next Tech